বিশেষ প্রতিনিধি | বান্দরবান
পার্বত্য জেলা বান্দরবানে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) অর্থায়নে বাস্তবায়নাধীন প্রায় ১২ কোটি টাকার স্যানিটেশন (ল্যাট্রিন নির্মাণ) প্রকল্প এখন অনিয়ম ও দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত হয়েছে। জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী অনুপম দে এবং ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘লাকী এন্টারপ্রাইজ’-এর যোগসাজশে নামমাত্র কাজের মাধ্যমে সরকারি অর্থ আত্মসাতের পাঁয়তারা চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে। মাঠপর্যায়ে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার এবং স্থানীয়দের ওপর জোরজুলুমের ঘটনায় জনমনে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
মাঠপর্যায়ের ভয়াবহ চিত্র ও অনিয়ম
বান্দরবান পৌরসভার বনরূপা সিদ্দিক নগরসহ আশপাশের এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, প্রকল্পের সরকারি শিডিউল বা প্রাক্কলন তোয়াক্কা না করেই চলছে নির্মাণকাজ।
নিম্নমানের সামগ্রী: বালুর পরিবর্তে কাদা-মাটি, অত্যন্ত নিম্নমানের লাল ইট, পুরনো রড এবং নামমাত্র সিমেন্ট ও নিম্নমানের কংক্রিট দিয়ে ঢালাই কাজ চালানো হচ্ছে।
শারীরিক শ্রম শোষণের অভিযোগ: ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান নিজ খরচে শ্রমিক দিয়ে মালামাল ও সেফটি ট্যাংকির রিং পরিবহন করার কথা থাকলেও, উপকারভোগী পরিবারের সদস্যদের দিয়েই জোরপূর্বক ভারী মালামাল বহন করানো হচ্ছে। সিদ্দিক নগরের স্থানীয় বাসিন্দা ও গাড়িচালক মুসলিম উদ্দিনসহ একাধিক উপকারভোগী এই শোষণের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।
হুমকি ও চাপ সৃষ্টি: তড়িঘড়ি করে নিম্নমানের কাজ করার সময় স্থানীয়রা প্রতিবাদ জানালে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি মো. সাদ্দাম হোসেন ও অন্য কর্মচারীরা কাজ বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দেন।
স্বজনপ্রীতি ও তালিকার জালিয়াতি
প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য দারিদ্র্যপীড়িত ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষকে সহায়তা করা হলেও বাস্তবে ঘটেছে উল্টো। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রভাবশালী মহলের স্বজন, সচ্ছল ব্যক্তি এবং একই পরিবারের একাধিক সদস্যকে স্যানিটেশন সুবিধা দেওয়া হয়েছে। প্রকৃত দরিদ্রদের বাদ দিয়ে কীভাবে এই তালিকা চূড়ান্ত করা হলো, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন এলাকাবাসী।
কর্মকর্তার নীরবতা ও ঠিকাদারের বক্তব্য
এসব অনিয়মের বিষয়ে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর বান্দরবান বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী অনুপম দে-কে বারবার জানানো হলেও তিনি কোনো পদক্ষেপ নেননি। বরং তার এই নীরবতা ও দায়সারা মনোভাবের সুযোগ নিয়ে ঠিকাদার মো. নাছির ও তার লোকজনকে বেপরোয়া আচরণের লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ এলাকাবাসীর। অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে নির্বাহী প্রকৌশলী অনুপম দে-এর মুঠোফোনে একাধিকবার চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
অন্যদিকে, অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করে ঠিকাদার মো. নাছির উদ্দিনের ম্যানেজার কাজল সেন জানান, “প্রকল্পের কাজে কোনো প্রকার অনিয়মের সুযোগ নেই। নির্দিষ্ট তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করলে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
জনস্বার্থের এই গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ রোধে এবং দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে উচ্চপর্যায়ের নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন বান্দরবানের সচেতন নাগরিক সমাজ।