কাগজের চারা, মাঠে মরা, তদন্ত ছাড়াই ফের দেড় কোটির টাকার দায়িত্বে তিন কোটি টাকার অভিযুক্ত কর্মকর্তা

0
1


​বিশেষ প্রতিবেদক, বান্দরবান
বান্দরবানে চারা বিতরণ ও প্রদর্শনীর নামে প্রায় ৩ কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে চরম ব্যর্থতা ও ব্যাপক অনিয়মের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। অথচ আগের প্রকল্পের কোনো মূল্যায়ন বা তদন্ত ছাড়াই বিতর্কিত সেই কর্মকর্তার হাতেই ন্যস্ত করা হয়েছে চলতি অর্থবছরের আরও ১ কোটি ৫০ লাখ টাকার নতুন দায়িত্ব।
​বান্দরবান বালাঘাটা হর্টিকালচার সেন্টারের উপপরিচালক (ডিডি) লিটন দেবনাথের বিরুদ্ধে ওঠা এই লুটপাটের ঘটনায় ক্ষুব্ধ স্থানীয় কৃষক ও সুশীল সমাজ।
​কাগজে-কলমে সাফল্য, মাঠে মিলল না ‘বাঁশের কঞ্চিও’
পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অর্থায়নে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদের মাধ্যমে ৩ কোটি টাকার একটি ফলদ ও বনজ প্রকল্প অনুমোদন পায়। রুমা, থানচি, রোয়াংছড়ি, লামা, আলীকদম, নাইক্ষ্যংছড়ি ও বান্দরবান সদর উপজেলার কৃষকদের আর্থসামাজিক উন্নয়নের লক্ষ্যে এ অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়।
​প্রকল্পটি কাগজে-কলমে পুরোপুরি বাস্তবায়িত দেখানো হলেও বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। অনুসন্ধানে জানা যায়, ওই অর্থবছরে বালাঘাটা হর্টিকালচার সেন্টারে নিজস্ব কোনো বনজ চারা উৎপাদিত হয়নি এবং ফলদ চারাও ছিল অপ্রতুল। ফলে বেসরকারি নার্সারি থেকে নিম্নমানের ও দুর্বল চারা চড়া দামে কিনে এনে কৃষকদের মাঝে বিতরণ করা হয়।
​থানচির ভুক্তভোগী কৃষক অংশৈ মারমা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আমাদের উন্নয়নের কথা বলে যেসব চারা দেওয়া হয়েছে, তার অধিকাংশ মরা। সুতার মতো চিকন বাঁশের চারা রোপণের পরই শুকিয়ে গেছে। সরকারের কোটি কোটি টাকা খরচ হলেও কৃষকের এক টাকার উপকারও হয়নি।”
​কৃষকদের দাবি, লিটন দেবনাথের তত্ত্বাবধানে কাগজে-কলমে যে প্রদর্শনীর হিসাব দেখানো হয়েছে, মাঠে তার ১ শতাংশের অস্তিত্বও নেই।
​নতুন বরাদ্দে নতুন বিতর্কের আড়ালে বিল-ভাউচারের কারসাজি
অভিযোগ উঠেছে, জেলা পরিষদকে কাগজে-কলমে ‘সফলতার গল্প’ শুনিয়ে চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ১ লাখ ফলদ ও বনজ চারা বিতরণ, রোপণ ও প্রদর্শনীর দায়িত্ব পুনরায় বাগিয়ে নিয়েছেন লিটন দেবনাথ। প্রথম ধাপে ইতোমধ্যে ১ কোটি ৫০ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
​অভিযোগ রয়েছে, এবারও হর্টিকালচার সেন্টারে পর্যাপ্ত মজুদ না থাকায় বাইর থেকে কিনে আনা নিম্নমানের চারা বিতরণ করা হচ্ছে। তবে দাপ্তরিক বিল-ভাউচারে সেগুলোকে হর্টিকালচার সেন্টারের উৎপাদিত ‘উন্নতমানের চারা’ হিসেবে দেখিয়ে বিপুল অঙ্কের অর্থ আত্মসাতের প্রক্রিয়া চলছে।
​রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের নেতারাও এ নিয়ে সোচ্চার হয়েছেন:
​বান্দরবান জেলা কৃষক দলের আহ্বায়ক ইয়াসিনুল হক রিপন: “আওয়ামী লীগ সরকারের কৃষিমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ হওয়ায় বদলি হয়ে এসেও এই কর্মকর্তা বর্তমান সরকারের কোনো জনকল্যাণমূলক প্রকল্প বাস্তবায়নে আন্তরিক নন।”
​দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি অংচমং: “যে কর্মকর্তা ৩ কোটি টাকার দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত, তাকে পুনরায় দেড় কোটি টাকার দায়িত্ব দেওয়া আশ্চর্যজনক! জেলা পরিষদের অসাধু কর্মকর্তাদের মদদ ছাড়া এই লুটপাট সম্ভব নয়। অবিলম্বে তদন্ত করে তার সর্বোচ্চ শাস্তি হওয়া উচিত।”
​কর্মকর্তার ‘ম্যানেজ’ করার চেষ্টা, প্রশাসনের আশ্বাস
নজিরবিহীন এই অনিয়মের বিষয়ে জানতে চাইলে উপপরিচালক লিটন দেবনাথ সুনির্দিষ্ট কোনো উত্তর না দিয়ে বিষয়টি ঢাকা দেওয়ার চেষ্টা করেন। তিনি বলেন, “কোনো সমস্যা নেই। একটু পজিটিভ নিউজ করুন। আমরা আপনার সঙ্গে আছি।”
​অন্যদিকে, বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদের মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম জানান, দুর্নীতির বিষয়ে জেলা পরিষদ জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করে। অনিয়ম প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে সরাসরি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
​নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে কোটি কোটি টাকার সরকারি অর্থ অপচয়ের এই ঘটনায় হর্টিকালচার সেন্টার ও জেলা পরিষদের ভূমিকা নিয়ে জনমনে তীব্র অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here