পানির প্রজেক্টের ৪৫ কোটি হাওয়া: কেঁচো খুঁড়তে নামতেই তথ্য আবেদনে প্রকৌশলীর নিষেধাজ্ঞা!

0
2

বিশেষ প্রতিবেদক:

পার্বত্য জেলা বান্দরবানে সুপেয় পানি ও স্যানিটেশন ব্যবস্থার নামে বরাদ্দ করা ৪৫ কোটি ১৬ লাখ ২০ হাজার টাকার সরকারি প্রকল্প কাগজে-কলমে ‘শতভাগ সফল’, কিন্তু বাস্তবে তার অগ্রগতি মাত্র ৪ শতাংশ! ভয়াবহ এই অর্থ লোপাট ও নজিরবিহীন দুর্নীতি ঢাকতে এবার সাংবিধানিক আইন ‘তথ্য অধিকার’ প্রয়োগে সরাসরি বাধা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে জেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী অনুপম দের বিরুদ্ধে।

​মাঠপর্যায়ে প্রকল্পের অস্তিত্ব না থাকলেও বিল তুলে নিয়ে অর্থ আত্মসাতের খবর ফাঁস হতেই চরম দুর্নীতিগ্রস্ত এই চক্রটি নিজেদের আত্মরক্ষায় তথ্য গোপনের পথ বেছে নিয়েছে।

​আইন উপেক্ষা করে তথ্য আবেদনে বাধা

​সোমবার (৩১ আগস্ট) বাস্তবায়নাধীন পানি ও স্যানিটেশন প্রকল্পের তথ্য, বিল-ভাউচার ও কাজের তালিকা চেয়ে তথ্য অধিকার আইনে আবেদন করতে যান স্থানীয় সাংবাদিকরা। তবে অধিদপ্তরের কর্মচারীরা আবেদনটি গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানান।

​অফিসের মাস্টার রোলে কর্মরত অফিস সহায়ক সুমন দাশ ও হিসাব সহকারী থংপ্রে ম্রো স্পষ্ট জানিয়ে দেন, “নির্বাহী প্রকৌশলী অনুপম দে স্যার ছাড়া তথ্য অধিকার আইনের কোনো আবেদন না নেওয়ার জন্য মৌখিক নির্দেশনা রয়েছে।”

​পূর্বে একাধিকবার আবেদন করেও কোনো তথ্য না পাওয়ার অভিযোগ রয়েছে এ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। সাংবাদিকদের এড়াতে টানা কয়েকদিন ধরে তিনি এবং তার অধীনস্থ জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা অফিসে অনুপস্থিত রয়েছেন। এমনকি সরকারি নম্বরে একাধিক কল ও হোয়াটসঅ্যাপে মেসেজ পাঠালেও অনুপম দে কোনো উত্তর দেননি।

​কাগজে শতভাগ, বাস্তবে ৪ শতাংশ: প্রজেক্টের নামে হরিলুট

​পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আওতায় ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ‘বান্দরবান পার্বত্য জেলার উপজেলাগুলোতে বিভিন্ন প্রযুক্তির মাধ্যমে সুপেয় পানি সরবরাহ ও স্যানিটেশন ব্যবস্থাকরণ’ শীর্ষক ৪৫.১৬ কোটি টাকার প্রকল্পটি বাস্তবায়নের দায়িত্বে রয়েছেন প্রকল্প পরিচালক (পিডি) ও বান্দরবান জেলা পরিষদের মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ নজরুল ইসলাম এবং উপ-প্রকল্প পরিচালক (ডিপিডি) অনুপম দে।

​প্রকল্পের নামে যেসব কাজের ভুয়া কাগজ বানিয়ে শতভাগ বিল তোলা হয়েছে, তার একটি চিত্র:

  • ​নলকূপ ও পাইপলাইন: পাম্পসহ ৮৫টি গভীর নলকূপ, ৮৫টি পাম্প হাউস বিদ্যুৎ সংযোগ ও ৮৫ কিলোমিটার দীর্ঘ পাইপলাইন দেখানো হলেও বাস্তবে সিংহভাগেরই অস্তিত্ব নেই।
  • ​অন্যান্য অবকাঠামো: ১০টি পরীক্ষামূলক নলকূপ, ১২টি জিএফএস মেরামত, ১০টি নতুন জিএফএস, ৫৮৩টি রিংওয়েল ও ১৪০টি রেইন ওয়াটার হার্ভেস্টিং এবং ৩০টি পাবলিক টয়লেট নির্মাণের লক্ষ্যমাত্রা কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ।

​কেনাকাটা ও খরচের নামে ‘পকেটস্থ’ টাকার হিসাব

​প্রকল্পের প্রশাসনিক ও মনিহারি খরচ দেখিয়ে বিপুল পরিমাণ টাকা আত্মসাতের নীল নকশা করা হয়েছে। বিভিন্ন অপ্রাসঙ্গিক খাতে রাখা অস্বাভাবিক বরাদ্দের নমুনা:

  • ​অভ্যন্তরীণ ভ্রমণ ব্যয়: ৪ লাখ ৯০ হাজার টাকা
  • ​স্টেশনারি, সিল ও স্ট্যাম্প: ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা
  • ​প্রচার ও বিজ্ঞাপন: ৫ লাখ ২৫ হাজার টাকা
  • ​সম্মানী ও পারিশ্রমিক: ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা
  • ​মনিহারি ও অন্যান্য: ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা
  • ​কম্পিউটার সামগ্রী ক্রয়: ৩ লাখ ১২ হাজার টাকা

​জনস্বার্থে সুপেয় পানির মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে এমন হরিলুট এবং তা ঢাকতে তথ্য অধিকার আইন ভঙ্গের ঘটনায় ক্ষোভে ফুসছে স্থানীয়রা। ভুয়া বিল-ভাউচার দিয়ে সরকারি টাকা আত্মসাতের বিরুদ্ধে উচ্চপর্যায়ের নিরপেক্ষ তদন্ত ও অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার জোর দাবি উঠেছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here