বিশেষ প্রতিবেদক:
পার্বত্য জেলা বান্দরবানে সুপেয় পানি ও স্যানিটেশন ব্যবস্থার নামে বরাদ্দ করা ৪৫ কোটি ১৬ লাখ ২০ হাজার টাকার সরকারি প্রকল্প কাগজে-কলমে ‘শতভাগ সফল’, কিন্তু বাস্তবে তার অগ্রগতি মাত্র ৪ শতাংশ! ভয়াবহ এই অর্থ লোপাট ও নজিরবিহীন দুর্নীতি ঢাকতে এবার সাংবিধানিক আইন ‘তথ্য অধিকার’ প্রয়োগে সরাসরি বাধা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে জেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী অনুপম দের বিরুদ্ধে।
মাঠপর্যায়ে প্রকল্পের অস্তিত্ব না থাকলেও বিল তুলে নিয়ে অর্থ আত্মসাতের খবর ফাঁস হতেই চরম দুর্নীতিগ্রস্ত এই চক্রটি নিজেদের আত্মরক্ষায় তথ্য গোপনের পথ বেছে নিয়েছে।
আইন উপেক্ষা করে তথ্য আবেদনে বাধা
সোমবার (৩১ আগস্ট) বাস্তবায়নাধীন পানি ও স্যানিটেশন প্রকল্পের তথ্য, বিল-ভাউচার ও কাজের তালিকা চেয়ে তথ্য অধিকার আইনে আবেদন করতে যান স্থানীয় সাংবাদিকরা। তবে অধিদপ্তরের কর্মচারীরা আবেদনটি গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানান।
অফিসের মাস্টার রোলে কর্মরত অফিস সহায়ক সুমন দাশ ও হিসাব সহকারী থংপ্রে ম্রো স্পষ্ট জানিয়ে দেন, “নির্বাহী প্রকৌশলী অনুপম দে স্যার ছাড়া তথ্য অধিকার আইনের কোনো আবেদন না নেওয়ার জন্য মৌখিক নির্দেশনা রয়েছে।”
পূর্বে একাধিকবার আবেদন করেও কোনো তথ্য না পাওয়ার অভিযোগ রয়েছে এ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। সাংবাদিকদের এড়াতে টানা কয়েকদিন ধরে তিনি এবং তার অধীনস্থ জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা অফিসে অনুপস্থিত রয়েছেন। এমনকি সরকারি নম্বরে একাধিক কল ও হোয়াটসঅ্যাপে মেসেজ পাঠালেও অনুপম দে কোনো উত্তর দেননি।
কাগজে শতভাগ, বাস্তবে ৪ শতাংশ: প্রজেক্টের নামে হরিলুট
পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আওতায় ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ‘বান্দরবান পার্বত্য জেলার উপজেলাগুলোতে বিভিন্ন প্রযুক্তির মাধ্যমে সুপেয় পানি সরবরাহ ও স্যানিটেশন ব্যবস্থাকরণ’ শীর্ষক ৪৫.১৬ কোটি টাকার প্রকল্পটি বাস্তবায়নের দায়িত্বে রয়েছেন প্রকল্প পরিচালক (পিডি) ও বান্দরবান জেলা পরিষদের মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ নজরুল ইসলাম এবং উপ-প্রকল্প পরিচালক (ডিপিডি) অনুপম দে।
প্রকল্পের নামে যেসব কাজের ভুয়া কাগজ বানিয়ে শতভাগ বিল তোলা হয়েছে, তার একটি চিত্র:
- নলকূপ ও পাইপলাইন: পাম্পসহ ৮৫টি গভীর নলকূপ, ৮৫টি পাম্প হাউস বিদ্যুৎ সংযোগ ও ৮৫ কিলোমিটার দীর্ঘ পাইপলাইন দেখানো হলেও বাস্তবে সিংহভাগেরই অস্তিত্ব নেই।
- অন্যান্য অবকাঠামো: ১০টি পরীক্ষামূলক নলকূপ, ১২টি জিএফএস মেরামত, ১০টি নতুন জিএফএস, ৫৮৩টি রিংওয়েল ও ১৪০টি রেইন ওয়াটার হার্ভেস্টিং এবং ৩০টি পাবলিক টয়লেট নির্মাণের লক্ষ্যমাত্রা কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ।
কেনাকাটা ও খরচের নামে ‘পকেটস্থ’ টাকার হিসাব
প্রকল্পের প্রশাসনিক ও মনিহারি খরচ দেখিয়ে বিপুল পরিমাণ টাকা আত্মসাতের নীল নকশা করা হয়েছে। বিভিন্ন অপ্রাসঙ্গিক খাতে রাখা অস্বাভাবিক বরাদ্দের নমুনা:
- অভ্যন্তরীণ ভ্রমণ ব্যয়: ৪ লাখ ৯০ হাজার টাকা
- স্টেশনারি, সিল ও স্ট্যাম্প: ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা
- প্রচার ও বিজ্ঞাপন: ৫ লাখ ২৫ হাজার টাকা
- সম্মানী ও পারিশ্রমিক: ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা
- মনিহারি ও অন্যান্য: ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা
- কম্পিউটার সামগ্রী ক্রয়: ৩ লাখ ১২ হাজার টাকা
জনস্বার্থে সুপেয় পানির মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে এমন হরিলুট এবং তা ঢাকতে তথ্য অধিকার আইন ভঙ্গের ঘটনায় ক্ষোভে ফুসছে স্থানীয়রা। ভুয়া বিল-ভাউচার দিয়ে সরকারি টাকা আত্মসাতের বিরুদ্ধে উচ্চপর্যায়ের নিরপেক্ষ তদন্ত ও অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার জোর দাবি উঠেছে।