পাহাড়ের বুকজুড়ে সোনালি আভা: বান্দরবানে শুরু হয়েছে জুমের ধান কাটার উৎসব

0
1

​সুফল চাকমা, বান্দরবান:

সবুজ পাহাড়ের ঢালে ঢালে এখন রোদের মিষ্টি আলোয় ঝিকমিক করছে সোনালি ধানের শীষ। বান্দরবানের দুর্গম পাহাড়ি এলাকাগুলোতে শুরু হয়েছে ঐতিহ্যবাহী জুমের পাকা ধান কাটার উৎসব। মাথার ঘাম পায়ে ফেলে বছরজুড়ে করা পরিশ্রমের ফসল ঘরে তুলতে পাহাড়ি জনপদে এখন উৎসবমুখর পরিবেশ, জুমচাষিদের দম ফেলারও ফুসরত নেই।

​আশ্বিনের শুরুতেই পাহাড়ি ঢালু জমিতে ধান পাকার সঙ্গে সঙ্গে জুমিয়াদের মুখে ফুটে উঠেছে স্বস্তির মিষ্টি হাসি। চোখের দৃষ্টি যতদূর যায়—বিশাল সবুজের বুক চিরে শোভা পাচ্ছে সোনালি জুমের ক্ষেত। কোথাও ধান কাটার ধুম পড়েছে, কোথাওবা পাকা ধান ও ফসল রক্ষায় পরিবার নিয়ে জুমঘরে পাহারা দিচ্ছেন চাষিরা।

​প্রকৃতির কোলে এক টুকরো বাজার

সম্প্রতি বান্দরবান জেলা শহর থেকে ২০ কিলোমিটার দূরের রোয়াংছড়ি উপজেলার তারাছা ইউনিয়নের যামিনী পাড়ায় গিয়ে দেখা যায় এক অনন্য দৃশ্য। জুমের ধান কাটায় ব্যস্ত সময় পার করছেন ম্রো সম্প্রদায়ের নারী ও পুরুষেরা। ২৫ বছর পুলিশে চাকরি শেষে ঐতিহ্যবাহী জুম চাষে ফিরে আসা রিং লট ম্রো (৫৭) স্বপরিবারে ও নারী শ্রমিকদের নিয়ে জুম কাটার ফাঁকে বলেন, “জুম কেবল ধানের উৎস নয়, এটি আমাদের কাছে আস্ত এক প্রকৃতির বাজার। জুম থেকে ধানের পাশাপাশি মিষ্টি কুমড়া, ভুট্টা, মারফা, বেগুন, তিল, মরিচ, রোজেলাসহ প্রায় ৩০-৩৫ ধরনের সাথি ফসল পাওয়া যায়। বাজার থেকে শুধু লবণ আর নাপ্পি কিনলেই চলে, বাকি সব জুমেই মেলে।”

​জুম কাটার কাজে ব্যস্ত ১৯ বছর বয়সী নারী শ্রমিক সংডং ম্রো জানান, জুম চাষ পাহাড়ি সংস্কৃতির মূল ভিত্তি। জুমের ফসল নিজেদের চাহিদা মিটিয়ে বাজারে বিক্রি করে সংসারের বাড়তি আয়ও নিশ্চিত করে।

​বছরের দীর্ঘ কৃষিসোপান ও নবান্নের অপেক্ষা

জুম চাষ একটি দীর্ঘ ও বৈচিত্র্যময় প্রক্রিয়া। বছরের নভেম্বর-ডিসেম্বরে পাহাড় নির্বাচন দিয়ে যার সূচনা। এরপর জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারিতে জঙ্গল কাটা, মার্চ-এপ্রিলে ‘ফায়ারিং লাইন’ বানিয়ে তা পোড়ানো এবং বৈশাখের প্রথম বৃষ্টিতেই বীজ বপন করা হয়। প্রকৃতির ওপর ভিত্তি করে আগস্টের শেষ বা সেপ্টেম্বরের শুরুতে ধান কাটার কাজ শুরু হয়ে চলে অক্টোবর পর্যন্ত। এরপর ডিসেম্বরে পাহাড়ের ঘরে ঘরে শুরু হয় জুমের নতুন ধানের চাল দিয়ে বহুল প্রতীক্ষিত নবান্ন উৎসব।

​রেকর্ড আবাদ ও কৃষি বিভাগের প্রত্যাশা

বান্দরবান কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, জেলায় প্রতিবছরই বাড়ছে জুমের আবাদ।

  • ​২০২৩-২৪ অর্থবছর: ৮,৫৪০ হেক্টরে আবাদ, উৎপাদন ১০,৪৮৯.৭১ মেট্রিক টন।
  • ​২০২৪-২৫ অর্থবছর: ৮,২৬৭ হেক্টরে আবাদ, চালের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১২,৪৯৯.৪১ মেট্রিক টন।
  • ​চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছর: ১১,৮৯৫ হেক্টর লক্ষ্যমাত্রার পুরোটাতেই আবাদ সম্পন্ন, যেখানে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১৩,৩৮৭.৯৩ মেট্রিক টন চাল।

​বান্দরবান কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক কৃষিবিদ তৌফিক আহমেদ নূর জানান, রোয়াংছড়ি, রুমা, থানচি ও আলীকদমে ধান কাটা জোরদমে চলছে। সঠিক সময়ে বৃষ্টি হওয়ায় ফলন বেশ ভালো। কৃষি বিভাগ থেকে স্থানীয় জাতের পাশাপাশি উচ্চফলনশীল জাতের বীজ ব্যবহারে চাষিদের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।

​পাহাড়ের বুকজুড়ে শুরু হওয়া এই জুম কাটা উৎসব প্রমাণ করে—জুম শুধু পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর জীবিকার মাধ্যম নয়; এটি তাদের হাজার বছরের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও প্রকৃতির সঙ্গে বেঁচে থাকার এক অমর উপাখ্যান।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here